চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কর্মকান্ডে নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানের অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। একই সঙ্গে তিনি নৌ-সচিব ও বন্দর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ তুলেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সপ্তম সভায় এ অভিযোগ তুলেন ওই কমিটির অন্যতম সদস্য মহিউদ্দিন। রোববার দুপুরে বন্দর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মিলনায়তনে নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে নৌ-মন্ত্রী মহিউদ্দিনের অভিযোগগুলোকে ‘অভিযোগ’ না বলে ‘বক্তব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মহিউদ্দিন অভিযোগ করেন, নৌ-মন্ত্রীর অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল(এনসিটি) প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বন্দর। এছাড়া কর্ণফুলী ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বন্দর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন সাবেক এ মেয়র।
তবে লিখিত অভিযোগ বন্দর উপদেষ্টা কমিটিতে পাঠানো হলেও রোববারের সভায় উপস্থিত ছিলেন না মহিউদ্দিন চৌধুরী। অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি সভায় উপস্থিত হতে পারেননি বলে অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেছেন। মহিউদ্দিনের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান সাংবাদিকের বলেন,‘সাবেক মেয়র ও বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য মহিউদ্দিন চৌধুরী যেসব ব্ক্তব্য তুলে ধরেছেন সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি থাকলে আরো ভালো হতো। এরপরও এসব বিষয় বিবেচনায় রাখা হয়েছে।’
এনসিটি প্রকল্প নিয়ে মহিউদ্দিন অভিযোগ করেন, ‘এনসিটি প্রজেক্ট এখনো ঝুলে আছে কেন জানতে চাই। এ প্রজেক্টের জেটির কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। ইক্যুইপম্যান্টের অভাবে এনসিটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এর দায়িত্ব মন্ত্রী, সচিব ও চেয়ারম্যানকে নিতে হবে। মন্ত্রণালয়ের অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণে এ প্রজেক্টের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল যার ফলে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়নি। এ ব্যাপারে আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বন্দর ও মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে তা জানতে চাই?’
এদিকে ২২৯ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের কাজ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। চিঠিতে নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি বলেন,‘চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মেরিন প্যাসিফিক ব্রিকস’র ইট ভাটার তৈরি ইট এ প্রকল্পে ব্যবহার করতে নিষেধ করলেও নিম্নমানের এসব ইট এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য মেরিন প্যাসিফিক ব্রিকস এর মালিক আবু জাফর মো.সাদেক প্রকাশ বালু জাফর। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর এ প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি টাকা জরিমানা করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিং এর নামে কর্ণফুলী নদী ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে আসছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তবে এ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি বলেন,‘নদী ছোট হয়নি। পাড় বাধাই ও রাস্তার জন্য কেবল জায়গা নেয়া হয়েছে। কাজ শেষ হলেই পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে।’ নদী ছোট হয়নি বিষয়টি প্রমাণের জন্য সাংবাদিকের সামনে একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক খাদেমুল বাশার।
সেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে কর্ণফুলী নদীর গভীরতা আরো বাড়বে। তবে প্রশস্ততা বাড়ার বিষয়ে পরিস্কার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শেষ হলে নদী আরো বড় হবে।’ কি পরিমান বাড়বে তা সঠিকভাবে উল্লেখ না করলেও ১৩০ মিটার ‘ইফেক্টিভ ওয়াইড’ বাড়বে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। অবশ্য বর্তমানেও তা আছে। এনসিটি ব্যাকআপ প্রজেক্টের মেয়াদ এক বছর আগে শেষ হলেও কাজ এখনো শেষ হয়নি অভিযোগ করে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন,‘বন্দরের উর্ধ্ব্তন কর্মকর্তারা ‘ঘুষ’ নিয়ে বার বার এ প্রকল্পের মেয়ার বৃদ্ধি করছে। ফলে কাজের কোন অগ্রগতি নেই। যে কাজ হয়েছে তা নিম্নমানের। এ প্রজেক্টে ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।‘
এনসিটি নিয়ে সভা শেষে সাংবাদিকদের মন্ত্রী বলেন, ‘এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালনা করবে। কিন্তু উচ্চ আদালতে মামলার কারণে তা ঝুলে আছে।‘ জুনের মধ্যে পানগাঁ ইনলেন্ড কন্টেইনার টার্মিনাল কার্যক্রম চালু করার জন্য বন্দর চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সভায় বিজিএমইএ আট প্রস্তাবনা পেশ করেন। সভায় বন্দর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য সচিব চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল নিজাম উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম, সংসদ সদস্য মইনুদ্দিন খান বাদল, সাংসদ শামসুল হক, নৌ-সচিব নজরুল ইসলাম, বিজিএমইএ, চট্টগ্রাম চেম্বার, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার, বিকডা, বার্থ অপারেটর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।