চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামে সুন্নি মহাসমাবেশে দেশবরেণ্য আলেম-ওলামারা বলেছেন, বাতিলপন্থীদের সঙ্গে থেকে কেউ আগামীতে ক্ষমতায় যেতে পারবেনা, কেউ ক্ষমতায় থাকতেও পারবেনা। ক্ষমতায় যেতে হলে এবং ক্ষমতায় থাকতে হলে সুন্নি জনতার পক্ষে থাকতে হবে। শনিবার বিকেলে নগরীর লালদিঘী ময়দানে আহলে সুন্নতে ওয়াল জামা‘আত আয়োজিত এ মহাসমাবেশ থেকে ১২ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এসব দাবিতে আগামী ২৫ মে ঢাকায় মহাসমাবেশেরও ডাক দিয়েছে সংগঠনটি। গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় লংমার্চ পরবর্তী সমাবেশে হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছিলেন, ক্ষমতায় থাকতে এবং যেতে হলে হেফাজতে ইসলামের দাবি মানতে হবে। শনিবার মহাসমাবেশে সুন্নি আলেমরা কার্যত হেফাজতের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন। নাস্তিক ‘ব্লগার’সহ ইসলাম ও মহানবীর অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে আয়োজিত এ মহাসমাবেশে লালদিঘী ময়দানসহ আশাপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে লাখো মানুষের ঢল নামে। সমাবেশে সুন্নি আলেমরা হেফাজত ও জামায়াতকে বাতিলপন্থী আখ্যায়িত করে তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের সমালোচনার পাশাপাশি বিরোধী দল বিএনপি এবং সরকারী দলের কঠোর সমালোচনা করেন।
মহাসমাবেশের প্রধান বক্তা আহলে সুন্নতে ওয়াল জামা’আতের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের অধ্যক্ষ মাওলানা জালাল উদ্দিন আল কাদেরি বলেন, ‘যারা হাতে লাঠি নিয়ে মসজিদে ঢুকে ইসলামের অপমান করে, যারা ইসলামের নামে মানুষ হত্যা করে তারা কখনও প্রকৃত মুসলমান হতে পারেনা। দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি জনতা এ ধরনের কর্মকান্ড বরদাশত করতে পারেনা।’ তিনি বলেন, ‘ইসলামের নামে মানুষের উপর হামলা কখনও ইসলাম সমর্থন করেনা। ইসলামের নোমে দেশের বিরুদ্ধে কর্মকান্ড চলতে দেয়া যায়না। কেউ ইসলামের নাম দিয়ে দেশের মানুষের উপর আঘাত করবে আর সুন্নি জনতা সেটা চেয়ে দেখবেনা। তাদের প্রতিরোধে সুন্নি জনতাকে জেগে উঠতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাতিলপন্থীদের তোয়াজ করে আগামী কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবেনা, কেউ ক্ষমতায় থাকতেও পারবেনা। যারা সুন্নি জনতার পক্ষে থাকবে আগামীতে তারাই ক্ষমতায় থাকবে, আগামীতে তারাই ক্ষমতায় যাবে।’
মহাসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক ও আহলে সুন্নতে ওয়াল জামা’আতের প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা এম এ মতিন বলেন, ‘বিরোধী দল হেফাজত নামধারী কওমীদের সঙ্গে আঁতাত করছে। সরকারী দল এখন কওমী নির্ভর হয়েছে। এ দু’দল মনে করছে, তারা কওমী ছাড়া ক্ষমতায় যেতে পারবেনা। কিন্তু আমরা সুন্নি জনতা শুধু এক জায়গায়, এক প্রতীকে ভোট দেব। সুন্নি আলেম-ওলামারাই আগামীতে কে ক্ষমতায় যাবে সেটা নির্ধারণ করে দেবেন।’ এসময় এম এ মতিন আগামীতে সবাই ‘এক প্রতীকে’ ভোট দেবেন কিনা জানতে চাইলে লাখো জনতা হাত তুলে তাতে সমর্থন জানান।
এম এ মতিন বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের নামে দেশে মানুষ হত্যা চলছে। তাদের মাদ্রাসাগুলোতে জঙ্গী ট্রেনিং হয়। তারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান-পাকিস্তানের মত জঙ্গী রাষ্ট্র বানাতে চায়। কিন্তু সুন্নি মুসলমান জনতা বেঁচে থাকতে বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র বানাতে দেবেনা। জঙ্গীবাদ আর নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে সুন্নি জনতা রাজপথে থাকবে।’ মহাসমাবেশে সংহতি জানিয়ে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম কিছু কর্মসূচী দেয়ার পর বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রী তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেছেন। আমি ওই মন্ত্রীকে ধিক্কার জানাই। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কওমী মাদ্রাসার আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করেছিল, সুন্নি আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করেনি। এখন কওমীরাই তাদের গদি ধরে টানাটানি করছে।’
ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের মিছিলে হামলার প্রসঙ্গ টেনে নজিবুল বশর বলেন, ‘ফটিকছড়িতে হেফাজত আর জামায়াত মিলে যখন আক্রমণ করেছে তখন আওয়ামী লীগের নেতারা কি চুড়ি পরে বসেছিলেন ? আওয়ামী লীগ চুড়ি পরে বসে থাকতে পারে, আমরা সুন্নি, তরিকতপন্থীরা চুড়ি পরে বসে থাকবনা। এখন থেকে হেফাজত আর জামায়াত আমাদের উপর আক্রমণ করলে আমরা প্রতিরোধ করব।’
সংগঠনের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মুফতি ওবায়দুল হক নইমী বলেন, ‘নাস্তিক ব্লগারদের সর্বোচ্চ দেয়া হোক সেটা আমরা চাই। কিন্তু তার আগে সুন্নি আলেমদের মাধ্যমে কমিটি করে নাস্তিকদের চিহ্নিত করতে হবে। হেফাজতীরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, যুদ্ধের সময় মানুষ খুন করেছিল। তারাই আবার ২০১৩ সালে এসে জাতীয় পতাকা পদদলিত করছে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। যারা জাতীয় পতাকার অবমাননা করে তারাই আবার মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’
সংগঠনের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুস সামাদ বলেন, ‘উগ্রপন্থী জঙ্গীবাদী হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচীতে বিরোধী দল ছিল। আওয়ামী লীগের ওহাবিচক্রও সেই কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে তাদের কর্মসূচীকে বিশাল সমাবেশে পরিণত করেছেন। জঙ্গীবাদ দমনের কথা বলে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ এখন হেফাজতের তোষামোদ করছে। বিরোধী দল যেমন জঙ্গীবাদ লালন করছে, আওয়ামী লীগও তেমনি জঙ্গীবাদ তোষণ করছে।’
তিনি বলেন, ‘ওহাবি মাদ্রাসাগুলোতে জঙ্গীবাদের ট্রেনিং হচ্ছে। এসব মাদ্রাসায় এদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিদেশ থেকে তালেবান জঙ্গী এদেশের প্রবেশ করছে। সরকার কিংবা বিরোধী দল এদের প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ না করলে অচিরেই বাংলাদেশ পাকিস্তানে পরিণত হবে।’ সংগঠনের নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা যারা ক্ষমতায় আছেন সওয়াব হাসিলের জন্য আপনারা রমজান, ঈদে হেফাজত নেতা আহমদ শফীর মাদ্রাসায় যাকাত, ফিতরা দেন। কোরবানির ঈদে চামড়া দেন। আপনারা এসব সহযোগিতা বন্ধ করুন।’ সংগঠনের নেতা হারুনুর রশিদ মওদুদীর অনুসরণে মহানবীকে নিয়ে কটুক্তি করার অপরাধে হেফাজতে ইসলামের সভাপতি আহমদ শফীর ফাঁসর দাবি করেন।
আহলে সুন্নতে ওয়াল জামা’আতের কেন্দ্রীয় সভাপতি কাজী মো.নূরুল হক হাশেমির সভাপতিত্বে মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ কাজী মো.মঈনুদ্দিন আশরাফী, সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ আল হাসানী মাইজভান্ডারি, আবুল ফরাহ মো.ফরিদ উদ্দিন, সৈয়দ তাহসিন আহমেদ, সাইফুর রহমান প্রমুখ।
আহলে সুন্নতের ১২ দফা ও কর্মসূচী
মহাসমাবেশ থেকে উত্থাপিত ১২ দফা দাবির মধ্যে আছে, ফেসবুক, ব্লগসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ইসলাম অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে সংসদে আইন সংস্কার এবং দোষী ব্লগারদের গ্রেপ্তার করা।
- সংবিধানে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন।
- দেশকে চলমান সংকট থেকে উত্তরণে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ শুরু করা।
- হরতাল বন্ধে জাতীয় সংসদে আইন পাশ করা।
- নারীনীতি থেকে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী অংশ বাদ।
- কওমী মাদ্রাসাকে অভিন্ন মাদ্রাসা শিক্ষানীতির আওতায় আনা।
- ইসলামের নামে হেফাজত-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড কঠোরভাবে দমন করা।
- তবলীগ জামাতের আড়ালে জঙ্গীবাদি বিদেশী তালেবান গোষ্ঠীর দেশে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি।
- সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ করা।
- নাস্তিক, মওদুদী, ওহাবী, কাদিয়ানিসহ সকল ভ্রান্ত মতবাদের ইসলাম অবমাননাকর প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করা।
- মিয়ানমারসহ বিশ্বের দেশে দেশে ইসলামের উপর আক্রমণ বন্ধে জাতিসংঘ, বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশ সরকারের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। একইসঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করা।
- সুন্নি ওলামা-মাশায়েখ এবং বিভিন্ন মাজার খানকাহয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- মিডিয়া কর্মী, পুলিশসহ নিরীহ জনতার উপর হামলাকারী এবং সরকারী-বেসরকারী স্থাপনায় অগ্নিসংযোগকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা।
মহাসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক মাওলানা এম এ মতিন সমাবেশ থেকে এসব দাবি আদায়ে আগামী ২৫ মে ঢাকায় আরেকটি মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেন। এর আগে ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জে এবং ১১ মে নারায়ণগঞ্জে সমাবেশের ঘোষণা দেন মতিন। এছাড়া ঢাকায় মহাসমাবেশ থেকে পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন এম এ মতিন।