Tuesday, 12 March 2013

বুধবারের হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান গণজাগরণ মঞ্চের

চট্টগ্রাম: হেফাজত ইসলামের হরতাল আহ্বান এবং প্রতিহত করার হুমকি স্বত্ত্বেও আগামী বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রেসক্লাব চত্বরে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রামের গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠকরা। একইসঙ্গে হুমকিধমকি উপেক্ষা করে চট্টগ্রামবাসীকে স্বত:স্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি আগামী বুধবার হেফাজত ইসলামের ডাকা হরতাল প্রত্যাহারেরও আবেদন জানিয়েছেন তারা। তবে গণজাগরণ মঞ্চ হরতাল আহ্বানকারী দলের সঙ্গে কোন ধরনের সংঘাতে যাবেনা বলেও জানিয়েছেন সংগঠকরা। সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে গণজাগরণ মঞ্চের পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠকরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ও একুশ মেলা উদযাপন পরিষদের মহাসচিব মফিজুর রহমান। এসময় উপস্থিত ছিলেন গণজাগরণ মঞ্চ, চট্টগ্রামের সদস্য সচিব ও উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ-সভাপতি ডা.চন্দন দাশ এবং সমন্বয়কারী ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগের আহবায়ক শরিফ চৌহান। সংবাদ সম্মেলনে হেফাজত ইসলামের কর্মসূচীর বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের এ আন্দোলন অহিংস, অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের। হেফাজত ইসলাম নামের একটি সংগঠন যে কর্মসূচী দিয়েছে তা শিষ্টাচার এবং মানবতা বিরোধী। তারা আমাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচী বানচালের জন্য হরতাল দিয়েছে। আমরা মনে করি, মানুষ স্বত:স্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে তাদের এ কর্মসূচী প্রত্যাখান করবে।’ হেফাজত ইসলামের রক্তপাতের হুমকির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শরিফ চৌহান বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই অহিংস আন্দোলন করে আসছি। তাদের সঙ্গে আমরা সহিংস জায়গায় যাবনা। তবে আমাদের বিশ্বাস, তাদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সেদিন চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে আসবে। সহিংসতার জবাব মানুষ অহিংসভাবে দেবে। আর তাদের হুমকিধমকি, রক্তপাত ঘটানোর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখবে।’ এর আগে গত ৭ মার্চ ঢাকায় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে আগামী ১৩ মার্চ বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষোভ মিছিল এবং চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে মহাসমাবেশের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। শনিবার রাতে হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন কথিত নাস্তিক ব্লগারদের প্রতিহত করার নামে ওইদিন চট্টগ্রামে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে। এরপর সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে তারা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচী প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। প্রয়োজনে তারা গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল-সমাবেশের স্থানে পাল্টা কর্মসূচী পালনেরও হুমকি দেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা সম্মানিত আলেমদের অনুরোধ করছি, ১৩ মার্চের হরতাল প্রত্যাহার করুন। আমাদের এই আন্দোলন শুধুমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে। আমরা বিশ্বাস করি, যেসব ওলামা-মাশায়েখের নাম ব্যবহার করে এ হরতাল আহ্বান করা হয়েছে তারাও যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক, এটা কামনা করেন। তারাও জামায়াত-শিবিরকে ইসলামের অপব্যাখাকারী দল হিসেবে মনে করেন।’ তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেমিক সকল ওলামা-মাশায়েখদের প্রতি আমাদের আহ্বান, ইসলামের অপব্যাখাকারী জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণ, খুনসহ মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে সামিল হওয়ার।’ মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ধর্মীয় স্বাধীনতায়। আমরা কখনোই কোন ধর্মীয় নেতা কিংবা সংগঠনের বিরুদ্ধে কথা বলিনি। এমনকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনতে পারে এমন কোন কাজও আমরা করিনি।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির চক্র তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ব্লগসহ ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভুয়া একাউণ্ট খুলে মিথ্যা প্রচারণা শুরু করেছে। সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার কথা বলে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মকভাবে আঘাত করা হয়েছে। বাঁশের কেলা ডট দুবাই নামে ফেসবুকের ভুয়া একাউণ্ট করে বিকৃত তথ্য প্রচার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চক্রান্ত চালাচ্ছে।’ মফিজুর রহমান বলেন, ‘এ চট্টগ্রাম মাষ্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর চট্টগ্রাম। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সকল ‍আন্দোলনে চট্টগ্রামের সংগ্রামী জনগণ অগ্রসেনানী হিসেবে কাজ করেছে। সেই পথ ধরে আগামী বুধবারের মহাসমাবেশে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের সকল নাগরিকদের স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’ গণজাগরণ মঞ্চের মিছিল-সমাবেশের স্থানে পাল্টা কর্মসূচী দেয়ার হুমকির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শরিফ চৌহান বলেন, ‘গত ৭ মার্চ আমাদের কর্মসূচী ঢাকা থেকে ঘোষিত হয়েছে। এরপর আমরা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নিয়েছি। হঠাৎ করে কেউ এসে আমাদের জায়গায় সমাবেশের ঘোষণা দিলে সেটি হবে অবৈধ এবং অন্যায়। সুতরাং অবৈধ কর্মসূচীর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সিদ্ধান্ত নেবে।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কুন্তল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী, সিইউজে’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিমউদ্দিন শ্যামল, সাংবাদিক হাসান ফেরদৌস, আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান, উদীচী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক সুনীল ধর, সাবেক ছাত্রনেতা শওকত হোসাইন ও রিপায়ন বড়ুয়া, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী তরুণ উদ্যোগের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রীতম দাশ, সংস্কৃতিকর্মী অনুপ বিশ্বাস, জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক দিয়াজ ইরফান চৌধুরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আরিফুল ইসলাম, জেলা ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ফারুক আহমেদ রুবেল, নগর ছাত্রফ্রণ্টের সভাপতি বিপ্লব বিজয় দাশসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এদিকে হেফাজতে ইসলামের হুমকি থাকলেও যে কোন মূল্যে কর্মসূচী পালন করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যেক্তারা। কর্মসূচী পালনে গণজাগরণ মঞ্চকে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয় গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যেক্তা উবা থোয়াই মারমা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের ঘোষণা অনুসারে ১৩ মার্চ হরতাল হলেও নির্দিষ্ট সময়েই সকাল ১১ টায় ক্যাম্পাসের বুদ্ধিজীবী চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, ক্যাম্পাসে সমাবেশকে সফল করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। সভায় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে সমাবেশে সর্বাত্বক সহযোগিতা করতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চের উপলক্ষে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েনসহ সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাটহাজারী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আফম নিজাম উদ্দিন। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সিরাজ-উদ-দৌল্লাহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সমাবেশকে নির্বিঘ্ন করতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’