চট্টগ্রাম: দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের প্রেক্ষিতে বাঁশখালী জুড়ে জামায়াত-শিবিরের তান্ডবের নয়দিন পরও স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে না যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড.মিজানুর রহমান। বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসযজ্ঞ পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব প্রতিক্রিয়া জানাতে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ প্রশ্ন তুলেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনা ঘটেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। আজ (শনিবার) আরেক মাসের নয় তারিখ। গত নয়দিনেও বাঁশখালীতে জাতীয় সংসদ সদস্যের পদধূলি পড়েনি।
এ বিষয়টি প্রশ্নের উদ্রেক করে। বাঁশখালীতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এরপরও যদি সংসদ সদস্য না যান, তাহলে তিনি কখন এলাকায় যাবেন ? আর কোন ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি মনে করবেন যে, তার এলাকায় যাওয়া উচিৎ ? কখন এমপি সাহেব জনগণের পাশে দাঁড়াবেন ?’ উল্লেখ্য বাঁশখালীর বর্তমান সংসদ সদস্য বিএনপি থেকে নির্বাচিত জাফরুল ইসলাম চৌধুরী। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেসময় বাঁশখালীতে চাঞ্চল্যকর ১১ হত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল। সহিংসতার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে প্রাণহানির বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘নিজের জীবন বিপন্নের আশংকা তৈরি না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ করা উচিৎ নয়। পরিস্থিতি যতক্ষণ পর্যন্ত চরম পর্যায়ে না পৌঁছুবে ততক্ষণ পর্যন্ত একটি প্রাণহানিও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা। তবে এক্ষেত্রে পুলিশ চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ, বগুড়ায় ৬ জন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে চরম আহত করলেও, তাদের হাত গুঁড়িয়ে দিলেও পুলিশ কিন্তু একটি গুলিও করেনি।’ সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘বাঁশখালীতে হামলা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা জঙ্গিবাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। কেননা যে লক্ষ্যবস্থুতে তারা আঘাত হেনেছে তা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি বলে কমিশন মনে করে।’ তিনি বলেন, ‘আক্রমনের ফলে ৩০ বছরের পুরানো রাষ্ট্রীয় দলিল, হাজার হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক যারমধ্যে ইসলাম শিক্ষা বিষয়ও আছে, সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দরিদ্র কৃষকের কৃষি সহায়তার ঋণসংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সরকারী যানবাহন, কম্পিউটার ও অন্যান্য আসবাবপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘জঙ্গীগোষ্ঠীর আক্রোশ এতেই প্রশমিত হয়নি, তাই অতি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ীতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বেছে বেছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন দোকান-পাট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এমনকি ওষুধের দোকানেও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বেছে বেছে উপাসনালয় ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে ক্ষান্ত হয়নি, দেব-দেবীর প্রতীমা ভাংচুর করে মন্দিরে রক্ষিত দানবাক্স লুট করা হয়েছে। এমনকি শ্মাশানঘাটের ইট ভেঙ্গে সেই ইট দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আঘাত করা হয়েছে। দাউ দাউ করে যখন হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর জ্বলছিল তখন জামাত-শিবির ও যুদ্ধাপরাধের বিরোধী শক্তি উল্লাস করে বলেছে-তোরা মালাউন, যতদিন তোরা নৌকায় ভোট দিবি ততদিন তোদের এই শাস্তি।’ তিনি বলেন, ‘সত্তর বছরের বৃদ্ধকে টয়লেট থেকে বের করে আঘাত করা হয়েছে। জান রক্ষার জন্য পানিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে রক্ষা পাননি। পানি থেকে তুলে মাথা দ্বিখন্ডিত করে হত্যা করা হয়েছে। ইট-লাঠি দিয়ে নারীদের হাতের শাঁখা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। লাঠি দিয়ে পেটানো হয়েছে। বর্তমানে বাশঁখালী হিন্দুপল্লীতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।’ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মিজানুর বলেন, ‘দেশপ্রেম প্রদর্শনের এখনই সময়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়। যদি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন, যদি আপনাদের রাজনীতি মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হয় তাহলে দয়া করে নষ্ট রাজনীতি পরিহান করুন। যে রাজনীতি আইনের শাসন নষ্ট করে, মানবতাকে অবজ্ঞা করে, রাষ্ট্রীয় সম্প্রীতি ধ্বংস করে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছাড়ায় এবং ধর্মের নামে মানুষকে হত্যা করতে উসকানি দেয়, সেই রাজনীতি পরিহার করুন।’ বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতায় তিনটি মন্দির, অর্ধশতাধিক দোকানপাট, ৭টি হিন্দুদের বাড়ি পোড়ানোসহ ৬২টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিরূপা দেওয়ানসহ কমিশনের কর্মকর্তারা এবং চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান, সাধারণ সম্পাদক মহসিন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।