চট্টগ্রাম: সমমনা ১২টি ইসলামী দলের ডাকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ঢিলেঢালাভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। রেললাইন অবরোধ ও টেম্পুতে আগুন দেয়ার মত বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় হরতালের তেমন প্রভাব পড়েনি। নগরীতে যানবাহন চলাচল প্রায় স্বাভাবিক ছিল। ভোরে দোকানপাটসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে সেগুলো খুলে দেয়া হয়।
হরতাল চলাকালে নগরী কিংবা জেলার কোথাও পিকেটারদের প্রকাশ্য কোন উপস্থিতি ছিলনা। জামায়াত-শিবিরের স্টাইলে চোরাগোপ্তাভাবে কখনও বের হয়ে ঝটিকা মিছিল করে তারা আবার পালিয়ে গেছে। রোববার ভোরে হরতাল শুরুর পর চট্টগ্রাম-নাজিরহাট ট্রেন রুটে হাটহাজারী স্টেশনের উত্তরে বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা লোহার পাত ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে। এর ফলে নাজিরহাট থেকে নগরীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা একটি ট্রেন ওই স্টেশনের অদূরে আটকা পড়ে। তবে পুলিশ যাবার পর অবরোধকারীরা ঘটনাস্থল ছেড়ে যান। এর বাইরে চট্টগ্রামের অভ্যন্তরীণ ও আন্ত:জেলা রুটের সব ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে গেছে বলে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সড়কের হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় হরতালকারীরা বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে সড়কে অবস্থান নেয়। এসময় তারা যানবাহন চলাচলে বাধা দেয় এর আগে ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নগরীর কোতয়ালী থানার সিনেমা প্যালেস এলাকায় একদল হরতাল সমর্থক আকস্মিকভাবে ঝটিকা মিছিল বের করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এরপর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হরতাল সমর্থকরা নগরীর আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের অদূরে একটি টেম্পুতে আগুন লাগিয়ে দেয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে নগরীর কাপাসগোলা এলাকায় মিছিল করার চেষ্টা করে হরতালকারীরা। এসময় তারা একটি টেম্পুতে ভাংচুর চালালে পুলিশ ধাওয়া দিলে পালিয়ে যায়। সকালে নগরীর টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, বাদামতল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণে বাস, ট্রাক, টেম্পু, হিউম্যান হলার, অটোরিক্সাসহ গণপরিবহন চলাচল করছে। এসব এলাকায় অধিকাংশ দোকানপাটসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা দেখা গেছে। সকালে নগরীর সিইপিজেড মোড়ে গিয়ে হরতালের কোন চিহ্নই দেখা যায়নি। সেখানে যানবাহন চলাচল একেবারেই স্বাভাবিক দেখা গেছে। হাজার হাজার শ্রমিককে নির্বিঘ্নে সিইপিজেডে ঢুকতেও দেখা গেছে। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম বন্দরের ভিতের জেটিতে এবং বহির্নোঙ্গরে জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা স্বাভাবিক ছিল। তুলনামূলকভাবে কম হলেও পণ্য নিয়ে পরিবহন বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে। নগরীতে সরকারী-বেসরকারী অফিস, শিল্প, কলকারখানা খোলা ছিল। তবে স্কুল-কলেজসহ অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। নগরীর অভ্যন্তরীণ রুটে যানবাহন চলাচল প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ছিল একেবারেই কম। কিছু যানবাহন ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে সকালে চট্টগ্রাম ছেড়ে যায় বলে জানা গেছে। এদিকে হরতালকে কেন্দ্র করে নগরীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে পুলিশ। নগরীর ৮৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েণ্টে প্রায় দেড় হাজার পুলিশ মোতায়েন আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে গত শুক্রবার জামায়াত-শিবির ও বিভিন্ন ইসলামী দলের ব্যানারে কর্মীরা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটায়। এরপর আবার তাদের উপর হামলার প্রতিবাদে রোববার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে ১২টি সমমনা ইসলামী দল। বিএনপি ও জামায়াত এ হরতালে নৈতিক সমর্থন দেয়। এদিকে গণজাগরণ মঞ্চ, চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে রোববারের হরতালকে `জামায়াত রক্ষার হরতাল` ঘোষণা দিয়ে তা প্রতিহত করে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্ত্বরে অবস্থান নিয়েছে জনতা। রোববার সকাল ১০টা থেকে গণজাগরণ মঞ্চে হরতাল বিরোধী বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে তারা। এরপর বেলা ১২টায় গণজাগরণ মঞ্চ থেকে হরতাল বিরোধী মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি জামালখান, চেরাগি পাহাড় মোড়, আন্দরকিল্লা হয়ে পুন:রায় গণজাগরণ মঞ্চে এসে শেষ হয়। মিছিলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ অংশ নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা এতে অংশ নেন। এর আগে হরতালের প্রতিবাদে সর্বস্তরের জনতা নগরীর জামালখানে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে গণজাগরণ মঞ্চ চত্বরে জড়ো হন। এদিকে সন্দেহজনক আচরণের কারণে গণজাগরণ মঞ্চ এলাকা থেকে দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে হরতাল বিরোধী মিছিল বের করা হয় বলে খবর পাওয়া গেছে।