চট্টগ্রাম: শুকনো মৌসুম জুড়ে খাল, নালা-নর্দমা পরিস্কারের নামে মাটি কাটার মহোৎসব আর কোটি কোটি টাকার শ্রাদ্ধ হলেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছেনা নগরবাসীর। মেয়র এম মনজুর আলম বারবার প্রতিশ্রুতি দিলে কার্যত জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনি সিটি কর্পোরেশন। ফলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি মিলছেনা নগরবাসীর। শনিবার মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ নীচু এলাকা তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা আগামী বর্ষা মৌসুমেও নগরবাসীর দুর্ভোগ থেকে মুক্তি না মেলার বার্তা দিয়েছে। অভিযোগ আছে, সিটি কর্পোরেশন প্রতিবছর ঢাকঢোল পিটিয়ে খাল, নালা-নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলন করে সেগুলো দ্রুত অপসারণ না করে জমা করে রাখা হয় খাল বা নালার পাড়েই। দীর্ঘসময় ধরে মাটি কিংবা আবর্জনাগুলো সেখানে পড়ে থাকার পর এক সময় গড়িয়ে আবারও খাল-নালায় গিয়ে পড়ে। মেয়রের অদক্ষতা এবং সঠিক নজরদারির অভাবে সিটি কর্পোরেশনের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে এভাবেই জলাবদ্ধতা নিরসন কার্যক্রমের নামে নগরবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনের জলাবদ্ধতা স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সচিব ও নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, ‘এ বছর আমরা যে পরিমাণ মাটি, আবর্জনা খাল, নালা থেকে উত্তোলন করেছি তাতে মনে হচ্ছে আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা গতবারের চেয়ে কমবে। তবে আকস্মিকভাবে বেশি কিংবা টানা বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা রোধ করা যাবেনা। আর বর্তমানে নগরীতে যেসব খাল, নালা-নর্দমা আছে সেগুলো দিয়ে জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসন সম্ভব নয়।’ শনিবার ভোর থেকে চট্টগ্রাম নগরীসহ আশপাশের এলাকায় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। দুপুরের পর সেই বৃষ্টি টানা রূপ নেয়। মাত্র ঘণ্টাখানেকের টানা বৃষ্টিতে নগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির মত অভিজাত আবাসিক এলাকা যেমন হাঁটু পানিতে ডুবে যায়, তেমনি বাকলিয়ায় মত নিচু এলাকাও তলিয়ে যায় হাঁটু থেকে কোমর পানিতে। পানিতে ডুবে যায় নগরীর প্রবর্তক মোড়, চকবাজার, বহদ্দারহাট, হালিশহর, আগ্রাবাদ সিডিএসহ নগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা।চলতি মাস বৈশাখ শুরুর পর চট্টগ্রামে কয়েক দফা হালকা বৃষ্টি হলেও শনিবারই মৌসুমের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। মৌসুমের এ প্রথম বৃষ্টিতেই নগরীতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা, মানুষকে পোহাতে হয়েছে চরম দুর্ভোগ। চসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরে মোট ১৬টি প্রাকৃতিক খাল আছে। খালগুলো হচ্ছে, চাক্তাই খাল, রাজা খাল, মহেশ খাল, নাছির খাল ছড়া, গয়নার ছড়া খাল, চশমা খাল, ডোম খাল, শীতল ঝরনা খাল, মির্জা খাল, বামন শাহী খাল, নয়া খাল, কালি খাল, বির্জা খাল, খন্দকিয়া ছড়া খাল, হিজড়া খাল ও কাজির খাল। এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার।
চলতি অর্থবছরে চাক্তাই খাল, মির্জা খাল, ডোম খাল, শীতলঝর্ণাসহ ৭টি বড় খালের মাটি স্কেভেটর দিয়ে উত্তোলনে ব্যয় করা হয়েছে দু’কোটি ২০ লক্ষ টাকা। সিটি কর্পোরেশনের সর্বশেষ সাধারণ সভায় মেয়র জানান, খালগুলো গড়ে সাড়ে ৩ ফুট গভীরে খনন করা হয়েছে। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। এর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে খালের মাটি উত্তোলনে খরচ হয় ১২ কোটি টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাত কোটি টাকা। গত তিন বছরে খালের মাটি উত্তোলন খাতে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও কোন সমাধান আসেনি।
এছাড়া নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে নালা-নর্দমা আছে প্রায় ৪১৮ কিলোমিটার। এসব নালা-নর্দমা পরিস্কারের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে এক কোটি ৪৭ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রতি ওয়ার্ডে বরাদ্দ দেয়া হয় ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা করে। সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি ডিভিশনে প্রায় ৫’শ শ্রমিক গত চারমাস ধরে এ কাজ করছে। কিন্তু চারমাস ধরে কাজ চললেও নগরীর অধিকাংশ এলাকাতেই এসব কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। বিভিন্ন নিচু এলাকার বড় কিছু নর্দমা ছাড়া নগরীর প্রায় সব এলাকার নালা-নর্দমা এখনও আবর্জনায় পরিপূর্ণ। শনিবার সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর অধিকাংশ এলাকায় নালা-নর্দমাগুলোতে পানি আটকে যায়। এতে রাস্তাঘাট পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে। চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘মাত্র এক ঘণ্টা বৃষ্টি হয়েছে কিন্তু বৃষ্টির বেগ ছিল বেশি। সেজন্য নালাগুলো পানি দ্রুত অপসারণে সক্ষম হয়নি।’
