চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা মোড় থেকে গ্রেফতার হওয়া হেফাজতে ইসলামের নেতা ড. মুহাম্মদ নছিম আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। প্রায় বছরখানেক আগে তাকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার কারণে তার ব্যাপারে তীব্র আপত্তি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শিক্ষকদের। কিন্তু তাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাকে শেষ পর্যন্ত প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ তার আমলে মুহাম্মদ নছিমকে নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেন, ‘নছিম যে হেফাজতের নেতা, সেটা আমি জানি না।’
তবে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম মহিউদ্দিন বলেছেন, ‘আন্দরকিল্লা মোড় থেকে আটকের পর গ্রেফতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের প্রভাষক মুহাম্মদ নছিমের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তিনি হেফাজতে ইসলামের ভলিন্টিয়ার ইনচার্জ।’ মহিউদ্দিন সেলিম আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীতে হেফাজতে ইসলামের সবক’টি সভা-সমাবেশে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।’এদিকে আন্দরকিল্লা মোড় থেকে আটক সবাইকে নিজেদের নেতাকর্মী দাবি করে হেফাজত ইসলাম বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রেরণ করে। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ নছিম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে মুহাম্মদ নছিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। তবে তাঁর এ নিয়োগের ব্যাপারে ওইসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শিক্ষকদের তীব্র আপত্তি ছিল। তারা তাকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ না দিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করেন। তারা এ ব্যাপারে বেশ তৎপর ছিলেন। কিন্তু সবার মতামতকে অগ্রাহ্য করে শেষপর্যন্ত মুহাম্মদ নছিমকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রমতে, মুহাম্মদ নছিমের পিতা অধ্যাপক আবদুর রশিদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের শিক্ষক। এছাড়া তার গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায়। প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফের গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। মূলত এ দু’কারণে আওয়ামীপন্থী ও প্রগতিশীল শিক্ষকদের আপত্তি সত্বেও মুহাম্মদ নাছিমকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শিক্ষকেরা। ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আওয়ামীপন্থী এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘মুহাম্মদ নছিম রাবিতে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়োগের আগে আমরা উপাচার্যকে অবহিত করি। কিন্তু তিনি আমাদের কথা শুনেননি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকার কথা জানা সত্বেও শুধুমাত্র আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে তাকে মহাজোট সরকারের আমলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।’
হেফাজত নেতা মুহাম্মদ নছিমের আটকের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ। উপাচার্য এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘তিনি আমার আমলে নিয়োগ পেয়েছেন,মুহাম্মদ নছিম হেফাজতের কোনো কমিটিতে থাকলে তা তদন্ত করে বের করেন।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক গাজী সালেহউদ্দিন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘বর্তমান উপাচার্যের আমলে শিক্ষক নিয়োগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা প্রাধান্য পাচ্ছেন, এ অভিযোগ আমরা প্রথম থেকেই করে আসছি। মুহাম্মদ নছিমের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়টির মাধ্যমে আমাদের অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হল।’ অধ্যাপক গাজী সালেহউদ্দিন আরও বলেন, ‘বর্তমান উপাচার্যের আমলে সবধরণের যোগ্যতা থাকা সত্বেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ ও ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে মিছিল সমাবেশ করতে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে আন্দকিল্লা মোড়ে জড়ো হন হেফাজতকর্মীরা। শুক্রবার বাদ জুমা আন্দরকিল্লা মোড় থেকে আটজনকে আটক করা হয়। নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোশতাক আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন,‘যেহেতু মিছিল-সমাবেশের জন্য হেফাজত কোন ধরনের অনুমতি নেয়নি তাই কর্মসূচি পালন করতে দেয়া হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘটনাস্থল থেকে আট নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।’
