Saturday, 11 May 2013

চট্টগ্রামের পাহাড়ে ঘরের দখল রক্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস


চট্টগ্রাম: পাহাড়ের পাদদেশে খুপড়ি মতন ছোট্ট একটি ঘর। সেখানেই পরিবার নিয়ে বসবাস। টানা বৃষ্টির এ মৌসুমে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে অনিশ্চয়তায়। সঙ্গে আছে মৃত্যুর হাতছানি। যেকোন মুহূর্তে পাহাড় ধসে পড়তে পারে ছোট্ট ঘরটির উপর। মুহূর্তেই নিভে যেতে পারে প্রাণ প্রদীপ! জীবন নিয়ে এত শঙ্কা! তারপরেও ঝুঁকিপূর্ণ বসত ঘর ছাড়তে রাজি নন ওদের অনেকেই! চট্টগ্রাম নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এসব পাহাড়ে বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছেন তারা।
অস্থায়ী পুনর্বাসনের ঘোষণা সত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ছেড়ে যেতে রাজি নন অনেকেই। কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এসব ঘরে বসবাস করেন নিম্ন আয়ের মানুষেরা। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, এ ঘর একবার ছেড়ে চলে গেলে পরবর্তীতে অন্যরা দখল করবে। তাই এ ভয়ে কেউ ঘর ছাড়তে রাজি নন।

চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব এবং অস্থায়ী পুনর্বাসন ও পরিদর্শন কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হুমায়ুন কবির বাংলানিউজকে বলেন,‘ঘরের দখল হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই পুনর্বাসনে যেতে রাজি হন না। তবে জীবন রক্ষার্থে আমরা সবাইকে নিরাপদ এলাকায় তাদেরকে তিনমাসের জন্য অস্থায়ী পুনর্বাসন করব। এসময়ে তাদের ঘর-বাড়ির নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টি আমরা দেখব।’এসব পাহাড়ে বসবাসরতদের সঙ্গে কথা বলে এ ধারণার সত্যতাও পাওয়া গেছে। নগরী আকবর শাহ বেলতলী ঘোনা পাহাড়ের পাদদেশে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন আলম। শনিবার দুপুরে বাংলানিউজকে বলেন, ‘পাহাড় ধসে পড়বে জানি। কিন্তু যামু কই। যাওয়ার তো কোনো জায়গা নেই।’

জেলা প্রশাসনের অস্থায়ী পুনর্বাসনের বিষয়টি জানানো হয় তাকে। কিন্তু বলেন, ‘তিনমাসের জন্য হয়ত নিরাপদে থাকতে পারব। তারপর কই থাকব। এসময়ের মধ্যে ঘর কেউ না কেউ দখল করে ফেলবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে থেকে যায়।’ চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তালিকা অনুযায়ী বন্দরনগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেলতলী ঘোনা পাহাড়। এ পাহাড়ে কয়েক’শ পরিবারের বসবাস করে। এ পাহাড়ে বসবাসরত সালাম ও সারোয়ারের মধ্যেও একই দুশ্চিন্তা। তারা জানান, ছোট্ট এ খুপড়ি ঘরের দখল নিতে উৎপেতে আছে অনেকেই। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন তারা। নগরীর আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আকবর শাহ রেলওয়ে পাহাড়। এ পাহাড়ের পাদদেশে প্রায় ৫০টি পরিবারের বসবাস। এখানকার এক মহিলা বলেন, ‘চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা এ ঘর দখল করে ফেলবে। তখন আমরা কই যাব।’

শনিবার এ পাহাড় পরিদর্শন গেলে অস্থায়ী পুনর্বাসন ও পরিদর্শন কমিটির সদস্যদের এ মহিলা বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে না। তাই আমাদের পুনর্বাসন খুব জরুরি। কিন্তু পুনর্বাসনের সময় আমাদের মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুর নিরাপত্তা দেয়া হোক। যাতে ফিরে এসে নিজের ঘরে উঠতে পারি।’ নগরীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ মতিঝর্ণা পাহাড়। এখানে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে খুপড়ি মতন একটি ঘরে থাকেন বিধবা হোসনে আরা। সম্প্রতি তিনি বাংলানিউজ বলেন,‘বৃষ্টির মৌসুমে ‍অন্যত্র চলে গেলে পরে দেখা যাবে কেউ না কেউ দখল করে ফেলছে বসত ঘরটি। তাই ঝুঁকি নিয়ে হলেও এখানে বসবাস করছি ২০ বছর ধরে।’ তাদের এ আশঙ্কার বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্টরা। গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় এ বিষয়ের উপর বিশদ আলোচনা হয়। সভায় জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান এসব ঘরের নিরাপত্তা দেয়ার উপর জোর দেন। বৈঠকে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘যাদেরকে অস্থায়ী পুনর্বাসন করা হবে, তাদের ঘরের নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’ নগর পুলিশের কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার মির্জা আবু সায়েম মাহমুদ বাংলানিউজকে বলেন,‘পুনর্বাসনের পর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর বসত ঘরের নিরাপত্তা দিতে আমরা প্রস্তুত আছি।’