চট্টগ্রাম: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ এর আঘাত থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রস্তুতি পর্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের জন্য চট্টগ্রামে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু আছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় ঘুর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির পাঁচ হাজার সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ সোমবার দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে এক হাজার ৩০০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিম, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে এক হাজার ২৩০ কি.মি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিম এবং মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে এক হাজার ২২০ কি.মি দক্ষিণে অবস্থান করছিল। সমূদ্রবন্দরসমূহে চার নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে আবহাওয়ার বিশেষ বুলেটিনে (ক্রমিক নম্বর-১২) এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে কয়েক দফায় জরুরি বৈঠক করে কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসন। এসব বৈঠকে উপস্থিত সংশ্লিষ্টদের ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেয়া হয়। এদিকে সোমবার বিকেলে জরুরী বৈঠক বসেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। রোববার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক জরুরি বৈঠকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম আবদুল কাদেরকে প্রধান করে ১৬ সদস্যের একটি সমন্বিত কমিটি গঠন করা হয়। সোমবার বিকেলে সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে আরেক দফা জরুরি বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও জরুরি বৈঠক করে। বৈঠকে মেয়র এম মনজুর আলম ও কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন। সিটি কর্পোরেশন ঘূর্ণিঝড়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় একটি কমিটি গঠন করেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে, কর্পোরেশনের ১১টি ওয়ার্ডকে ঘূর্ণিঝড়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওয়ার্ডগুলো নগরীর কাটগড়, পতেঙ্গা, বাকলিয়া, মোহরা ও চান্দগাঁও এলাকায় অবস্থিত। এসব ওয়ার্ডের অবস্থান বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলি নদীর উপকূলে।
এসব অঞ্চলের লোকজনদের থাকার জন্য কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত সকল স্কুল-কলেজকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে আনুষাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম। আশ্রয়কেন্দ্রের লোকজনদের সেবা দেয়ার জন্য কর্পোরেশনের ১০০ কর্মচারীর সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা হয়েছে। এ দলের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে আশ্রয়কেন্দ্রের লোকদের সেবা প্রদান করবে। চসিক মেয়র এম মনজুর আলম বলেন, ‘ঘুর্ণিঝড়ে যাতে প্রাণহানির ঘটনা না ঘটে এজন্য কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মানুষ যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠতে পারেন সে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
সিটি মেয়র জানান,‘সংকেত না নামা পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো চালু থাকবে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১০০জন কর্মচারী সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবেন।’ জেলা প্রশাসনের সমন্বিত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস এম আবদুল কাদের সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলায় আমরা প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছি। জেলা ও উপজেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খোলা রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ এস এম আবদুল কাদের জানান, ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (উপ-পরিচালক) আবদুল মালেক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ঘুর্ণিঝড় মোকাবেলায় উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় জনসাধারণকে দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতন করতে মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি শুকনা খাবার মজুদ রাখা হচ্ছে।’ তিনি জানান, ঘুর্ণিঝড়ে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলো হচ্ছে বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড ও মীরসরাই। এছাড়া বোয়ালখালী ও পটিয়ার অংশবিশেষ অঞ্চল অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। তবে দুর্যোগ মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এদিকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিও সোমবার বিকেলে ঘুর্ণিঝড় ‘মহাসেন’ এর মোকাবেলায় প্রস্তুতি বৈঠক করেছে। সোসাইটির চেয়ারম্যান ডা. শেখ শফিউল আজম বাংলানিউজকে বলেন,‘চট্টগ্রাম বিভাগে আমাদের প্রায় ছয় হাজার কর্মী আছে। বর্তমানে তারা বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছেন। তারা সেখানে ঘুর্ণিঝড়ের বিষয়টি প্রচার করবেন।’ এছাড়া যুব রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা বিভিন্ন উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান ডা. শেখ শফিউল আজম।
